ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠক

দুষ্প্রাপ্য খনিজের রফতানি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করবে চীন, শুল্কহার কমাবে যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানিল পাচার প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।

যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানিল পাচার প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন আমদানি শুরু ও দুষ্প্রাপ্য খনিজ রফতানিতে নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার বিষয়েও সম্মতি জানিয়েছেন তিনি। প্রতিদানে চীনা পণ্য আমদানিতে আরোপিত শুল্ক কমানোর ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে গতকাল অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে নিজ নিজ দেশের পক্ষ থেকে এসব ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। খবর রয়টার্স ও এপি।

দীর্ঘ পাঁচ বছর পর গতকালই প্রথম মুখোমুখি বৈঠকে অংশ নিলেন শি জিনপিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ সময় বিশ্বের শীর্ষ দুই অর্থনীতির মধ্যে চলমান শুল্ক বিবাদ প্রশমনে দুই দেশের পক্ষ থেকেই উঠে এসেছে ইতিবাচক বার্তা। বৈঠকটি নিয়ে একাধিকবার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর শি জিনপিং বলেছেন, পরস্পর বৈরিতা ও প্রতিযোগিতার চেয়ে এ ধরনের সংলাপই ভালো ফল নিয়ে আসতে পারে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউজে ফেরার পর এটিই ছিল তার প্রথম এশিয়া সফর। রোববার শুরু হওয়া পাঁচদিনের এ সফরে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গেও আলোচনায় বসেছেন তিনি। এসব আলোচনায় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক নিয়ে গতকালই এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ সময় বৈঠকটিকে ১০-এর মধ্যে ১২ রেটিং দেবেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘চীন থেকে আমদানীকৃত পণ্যে শুল্ক ৫৭ থেকে ৪৭ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। বিশেষ করে ফেন্টানিল-সংশ্লিষ্ট পণ্যগুলোর ওপর শুল্কহার ১০ শতাংশ করা হয়েছে। শি জিনপিং ফেন্টানিল পাচার বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।’

কয়েক সপ্তাহ আগে দুষ্প্রাপ্য খনিজ রফতানির ওপর নিয়ন্ত্রণ কঠোর করে বেইজিং। নতুন করে শুল্ক আরোপ করে এর জবাবও দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্পের এ সফরে গাড়ি, উড়োজাহাজ ও সমর শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপকরণটির রফতানি নিয়ন্ত্রণ স্থগিত রাখতে রাজি হয়েছে বেইজিং। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এ স্থগিতাদেশ এক বছর থাকবে। দুই পক্ষ ফেন্টানিলের বিস্তার মোকাবেলায় পারস্পরিক সহযোগিতা ও কৃষি বাণিজ্য সম্প্রসারণে সম্মত হয়েছে।

বুসানে অনুষ্ঠিত এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন (এপিইসি) শীর্ষ সম্মেলনের সাইডলাইনে চীনা ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের মধ্যে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে দুই প্রেসিডেন্টের মধ্যে আলোচনা হয়।

দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তির আলোকে অনুষ্ঠিত বৈঠকটির মাধ্যমে সর্বশেষ শতভাগ শুল্কের হুমকি এড়াতে পেরেছে বেইজিং। এ বৈঠকের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, মার্কিন প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের মধ্যে এখন অতি উচ্চ শুল্কের আওতায় রয়েছে শুধু ব্রাজিল ও ভারত।

শি জিনপিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠকের পর বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এশিয়ার প্রধান সূচক ও ইউরোপের ফিউচার সূচকগুলো ওঠানামার মধ্যে ছিল। চীনের মূল ভূখণ্ডের সাংহাই কম্পোজিট সূচক ১০ বছরের সর্বোচ্চ স্তর থেকে কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফিউচার মার্কেটে সয়াবিনের দামও কমেছে।

বৈঠক শুরুর আগে ওয়াল স্ট্রিট থেকে টোকিও পর্যন্ত বিশ্বের প্রধান শেয়ারবাজারগুলো রেকর্ড স্পর্শ করে। আশা করা হয়েছিল, বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে শুল্ক বিবাদসৃষ্ট পরিস্থিতির অবসান হবে। এ বিবাদ এরই মধ্যে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন ও ব্যবসায়িক পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের আস্থাকে নড়বড়ে করে দিয়েছে।

সিডনিভিত্তিক পরামর্শক সংস্থা বেসা ডেদার প্রধান অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম বাক বলেন, ‘ট্রাম্পের উচ্ছ্বসিত মন্তব্যের তুলনায় বাজারের প্রতিক্রিয়া সাবধানী ছিল।’

বৈঠকের শুরুতে শি জিনপিং ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বলেন, ‘বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর মধ্যে মাঝে মাঝে মতবিরোধ স্বাভাবিক। চীনের উন্নয়ন ও পুনর্জীবন ট্রাম্পের ‘‘মেকিং আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’’ লক্ষ্যের প্রতিবন্ধক নয়।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে শুল্ক কমানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে ‘সংবেদনশীল’ হিসেবে বিবেচিত প্রযুক্তির রফতানি নিয়ন্ত্রণ তুলে দেয়ার প্রস্তাব রেখেছিল চীন। একই সঙ্গে চীনা জাহাজে আরোপিত নতুন মার্কিন বন্দর ফি কমানোর প্রস্তাবও রাখা হয়। বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি ডোনাল্ড ট্রাম্প।

তবে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চীনের সামুদ্রিক, লজিস্টিকস ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পের ওপর সম্প্রতি আরোপিত বন্দরের ফি এক বছরের জন্য স্থগিত রাখার বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা জাহাজকে লক্ষ্য করে নেয়া পাল্টা ব্যবস্থা স্থগিত রাখবে বেইজিংও।

বৈঠকের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, এনভিডিয়ার ব্ল্যাকওয়েল এআই চিপ নিয়ে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি তার। তাইওয়ান ইস্যুতেও কোনো আলোচনা হয়নি।

বৈঠকের ঠিক আগে ৩৩ বছরের বিরতির পর মার্কিন সামরিক বাহিনীকে ফের পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা শুরুর নির্দেশ দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর কারণ হিসেবে রাশিয়া ও চীনের পরমাণু অস্ত্র সংখ্যা বাড়ানোর কথা উল্লেখ করেন তিনি।

এ বৈঠক ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্য চুক্তি সইয়ের প্রত্যাশা করা হয়েছিল। আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বেইজিং বলেছে, চূড়ান্ত কোনো চুক্তি হয়নি। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, ‘দুই দেশের প্রতিনিধি দল এরই মধ্যে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। তারা যেন দ্রুত ফলো-আপ কাজ শেষ করে, যাতে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ববাসীর জন্য দৃশ্যমান ফলাফল পাওয়া যায়।’

‘প্রতিযোগিতার চেয়ে সংলাপ উত্তম’ উল্লেখ করে চীনা প্রেসিডেন্ট জানান, অবৈধ অভিবাসন, টেলিকম প্রতারণা, মানি লন্ডারিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সংক্রামক রোগ প্রতিরোগে পরস্পরকে সহযোগিতা করতে পারে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র।

হোয়াইট হাউজ আশা করছে, আগামী বছরের মধ্যে দুই নেতার অংশগ্রহণে আরেকটি শীর্ষ বৈঠক হবে। ট্রাম্প বলেছেন, এপ্রিলে চীন সফর করবেন তিনি এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে শি জিনপিংকে স্বাগত জানাবেন।

আরও